আশুরার ফজিলত ও আমল

আশুরার ফজিলত

মহররম শব্দের অর্থ পবিত্র বা সম্মানিত। মুহররমকে মুহররম বলে অভিহিত করা হয়েছে কারণ এটি অতি সম্মানিত মাস। হিজরি সনের প্রথম মাস হচ্ছে মহররম। এ মাসটি কুরআনে বর্ণিত ‘আশহুরে হুরুম’ তথা হারামকৃত চার মাসের অন্তর্ভূক্ত। হাদিস শরীফে এসেছে- ‘মুহররম হলো আল্লাহর মাস’।

আর মহররমের ১০ তারিখ আশুরা নামে পরিচিত। আরবি আশারা শব্দ থেকে আশুরা শব্দের উৎপত্তি। আশারা মানে দশ আর আশুরা অর্থ হলো দশম দিবস। এ সম্পর্কে পাঠক সমীপে সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করার প্রয়াস চালাব। ইনশাহ আল্লাহ।

আশুরার দিনের ফজিলত

সৃষ্টির শুরু থেকে মহররমের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। ফলে আশুরা মর্যাদাবান ও মাহাত্ম্যপূর্ণ এবং স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছে।

আশুরার দিনটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কয়েকটি কারণ আছে। এই দিনে অসংখ্য ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

১. আশুরার দিন আল্লাহপাক পবিত্র লওহে মাহফুজ সৃষ্টি করেছেন।

২. ঐ দিনে আল্লাহপাক যাবতীয় সৃষ্টির রুহ সৃষ্টি করেছেন এবং হজরত আদম (আ) কে সৃষ্টি করে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন এবং তাঁর তওবা কবুল করেছেন।

৩. ঐ দিনে হজরত নূহ (আ) মহাপ্লাবনের শেষে জাহাজ থেকে তুরস্কের ‘জুদি’ নামক পর্বতে অবতরণ করেন।

৪. ঐ দিনে আল্লাহপাক হজরত ইব্রাহিম (আ) কে সৃষ্টি করেছেন এবং অগ্নিকুণ্ড থেকে নাজাত দিয়ে ছিলেন।

৫. হজরত মুসা (আ) তুর পর্বতে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাঁর ওপর তাওরাত কিতাব নাজিল করা হয়েছিল। তাঁর শত্রু ফেরাউনের নীল নদে ভরাডুবি হয়েছিল মহররমের এই ১০ তারিখে। ৬. এই দিনে হজরত আইয়ুব (আ.) রোগ থেকে মুক্তি পান।

৭. এদিনে হজরত ইয়াকুব (আ.) তার প্রিয় হারানো পুত্র হজরত ইউসুফ (আ) কে ৪০ বছর পর ফিরে পেয়েছিলেন।

৮. হজরত ইউনুস (আ) মাছের পেট থেকে দজলা নদীতে বের হয়েছিলেন এই দিনে।

৯. হজরত সুলাইমান (আ) এই দিনে পুনরায় রাজত্ব ফিরে পান।

১০. এদিনে হজরত ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেন এবং এদিনেই তাঁকে দুনিয়া থেকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়।

১১. ঐ দিনে হজরত জিব্রাইল (আ.) সর্বপ্রথম আল্লাহর রহমত নিয়ে রাসুল (সা) এর কাছে আগমন করেছিলেন।

১২. মহররমের কোনো এক শুক্রবার ইস্রাফিল (আ) এর সিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে পৃথিবী ধ্বংস হবে। (বুখারি- ১/৪৮১, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া- ১/১৩২, আল কামেল ফিত তারিখ- ১/১২২)

১৩. মহানবী (সা) এর ওফাতের অর্ধশতাব্দী পর ৬১ হিজরির ১০ মহররম শুক্রবার এক অসম যুদ্ধে হজরত হোসাইন (রা) ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শাহাদাতবরণ করেন।

শাহাদতের আগে হজরত হোসাইন (রা.) কুফাবাসীর উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার সারসংক্ষেপ হলো-

যে শাসক অত্যাচার করে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, সুন্নাতে নববির বিরোধিতা করে, অন্যায়ভাবে শক্তি প্রয়োগ করে মানুষের ওপর শাসন চালায়, তার এই অবস্থা দেখেশুনেও যে ব্যক্তি কথা ও কাজে এর প্রতিবাদ করে না, আল্লাহ তার পরিণাম ভালো করবেন না। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অষ্টম খণ্ড, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে কাসির (রহ)। 

আশুরার রোজা

এই দিনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আমল রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো রোজা পালন করা।  ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। দ্বিতীয় হিজরিতে শাবান মাসে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা নফল হয়ে যায়। তবে নফল রোজার মধ্যে আশুরার রোজা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ।

হিজরতের পর মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখতে পেলেন, ইহুদিরাও এদিনে রোজা রাখছে। হাদীস শরীফে এসেছে, “ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুলাহ (সা) মদীনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদীরা আশুরার দিনে সাওম পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন “এটা কোন দিন যে তোমরা সাওম পালন করছ? তারা বলল, এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন আল্লাহ তা’য়ালা মুছা (আ) ও তার সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরআউনকে তার দলবলসহ নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মুছা (আ) শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে সাওম পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও সাওম পালন করে থাকি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের চেয়ে আমরা মুছা (আ) এর অধিকতর ঘনিষ্ট ও নিকটবর্তী।”  অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) সাওম পালন করলেন ও অন্যদেরকে সাওম পালনের নির্দেশ দিলেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৭১৪) ।

মুসলিম শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘মহানবী (সা) যখন আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবিরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড়দিন মনে করে। (আমরা যদি এই দিনে রোজা রাখি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হয়ে যাবে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুল (সা) বললেন, ‘তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে) আগামী বছর ইনশাহ আল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করবো। (মুসলিম: ১১৩৪)

অন্য হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা আশুরার রোজা রাখো এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য ত্যাগ করো; আশুরার আগে বা পরে আরও একদিন রোজা রাখো।’ (মুসনাদে আহমদ: ১/২৪১)

আশুরার রোজার ফজিলত

হযরত আবু কাতাদা (রা) সূত্রে বর্ণিত,  রাসুল (সা) কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

আরও বর্ণিত আছে, ‘আশুরা দিবসের সাওম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, এর ফলে আগের বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম: ১/৩৫৮)

আয়েশা (রা) বলেন, ‘জাহিলিয়া যুগে কুরাইশরা আশুরা দিবসে রোজা পালন করতো। রাসুলুল্লাহ (সা)ও সে কালে রোজা পালন করতেন। মদিনায় এসেও তিনি রোজা পালন করতেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। রমজানের রোজার আদেশ নাজিল হলে আশুরা দিবসকে বর্জন করা হয়। এখন কেউ চাইলে তা পালন করুক, আর চাইলে তা বর্জন করুক।’ (বুখারি: ১/২৬৮)

আয়েশা (রা) আরো বলেন, ‘রাসুল (সা) বলেন, রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মহররমের আশুরার রোজা।’ (সুনানে কুবরা: ৪২১০)

হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।’ (মুসলিম: ১/৩৫৮)

আশুরার দিনে অন্য একটি আমল

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার-পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত খানাপিনার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহপাক পুরো বছর তার রিজিকে বরকত দান করবেন।’ (তাবরানি: ৯৩০৩)

আরো অনেক হাদিসে আশুরা দিবসে পরিবার-পরিজনের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করার ফযীলত সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে।

যেমন: ইমাম তাবারানীর ‘আল মুজামুল কাবীর’ গ্রন্থে আছে, আশুরার দিন যে তার পরিবারে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করবে সে সারা বছর স্বচ্ছলতায় কাটাবে। অন্য বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহ তাকে সারা বছর স্বচ্ছলতায় রাখবেন।

এ হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসীনে কেরামের মধ্যে এখতেলাফ রয়েছে। কেউ কেউ একে দুর্বল বলেছেন আবার কেউ কেউ হাসান বলেছেন। হাসান হাদিস দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য আর দুর্বল হাদিস ফযীলতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।

বিভিন্ন সাহাবি থেকে এই হাদিসটি বর্ণিত হওয়ায় আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ) সহ অনেক মুহাক্কিক আলেম হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। (জামিউস সগির-১০১৯)

সূতরাং সাধারণভাবে এ দিনে পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে কোনো অসুবিধা নেই।

আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন!!!

মো: নজরুল ইসলাম, ০১৭১৬-৩৮৬৯৫৮

What do you think?

0 points
Upvote Downvote

Comments

Leave a Reply

Loading…

0

Comments

0 comments

নামাজ পড়ার নিয়ম-কানুন

৩০ যাদুকরি গুণ