আমালিয়াত ১ম খন্ড, চতুর্থ অধ্যায়- ২য় পর্ব

লেখক: হযরত মাওলানা ক্বারী মো: নজরুল ইসলাম সাহেব, ভাদেশ্বরী। (এমএম, এমএ)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সময়ের স্বল্পতাহেতু সকল আয়াত বা বাক্যের হরকত দেয়া সম্ভব হয়নি।

ইনশাহ আল্লাহ ধীরে ধীরে প্রতিটি আয়াত বা বাক্যের হরকত সংযোজন করা হবে তথা যের, যবর, পেশ সংযোজন করা হবে। তাই আপডেট পেতে সাথে থাকুন।

দ্বিতীয় পর্ব শুরু

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ঋণ হলো জমিনের উপরে আল্লাহর ঝাণ্ডা, আল্লাহ  যখন কোনো বান্দাকে অপদস্থ করতে চান তখন তার কাদের উপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেন। (হাকিম)

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে এভাবে দোয়া করতে শুনেছি,

اللٰهمَّ انِّی اعوذُبِكَ مِنَ اَلْكُفْرِ وَالدينِ٠

উচ্চারণ- আউজুবিল্লাহি মিনাল কুফরী ওয়াদ দাইনি)

অর্থ- আমি আল্লাহপাকের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, কুফরী ও ঋণ  হতে ।

জনৈক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দেনা বা ঋণকে আপনি কুফুরের সমান মনে করেন? ইরশাদ হলো হ্যাঁ। (নাসায়ী ও হাকিম) 

মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কারো নিকট হতে টাকা-পয়সা ঋণ করে তা পরিশোধ না করেই মৃত্যূবরণ করে, কিয়ামতের দিন যখন না কোন টাকা-পয়সা থাকবে, না দিরহাম, দীনার থাকবে তখন তার নেকী দ্বারা ঐ ঋণ পরিশোধ করা হবে।

মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, ঋণদার ব্যক্তি যদি গরীব হয় আর ঋণদাতা যদি ঋণ পরিশোধ করার সময় আসার পর তাকে আরো সময় দান করে, তাহলে প্রতিদিন তার ঐ পরিমাণ সওয়াব লাভ হবে যে পরিমাণ সওয়াব ঐ টাকা দান করে দিলে পাইত। এবং ঋণ পরিশোধ করার সময় আসলে পুনরায় সময় বৃদ্ধি করে দিলে প্রতিদিন তার ঐ পরিমাণ সওয়াব লাভ হবে, যে পরিমাণ সওয়াব উক্ত টাকার দ্বিগুণ প্রতিদিন দান করলে পাইত। মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, আমি মে’রাজের রাত্রি বেহেস্তের দরজায় লিখা দেখেছি: দান-খয়রাত করলে এর সওয়াব ১০ গুণ আর কর্জ দিলে এর সওয়াব ১৮ গুণ পাওয়া যায়।
ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির কবরের অবস্থা
হযরত শাইবান বিন হাসান বলেন, আমার পিতা (হাসান) এবং আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়েদ এ দু‘জন জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হলেন। একদা তাঁরা শত্রুপক্ষের একটি প্রশস্থ ও গভীর কুপ দখল করে ফেললেন। শত্রুপক্ষের যেহেতু কুপের মধ্যে আত্মগোপন করার সম্ভাবনা ছিল তাই তাঁরা একটি বড় পাতিলায় রশি বেঁধে কুপের মধ্যখানে ছেড়ে দিলেন। রশি বাঁধাই করা পাতিলা যখন কুপের নীচে পৌছে গেল তখন সকলে মিলে সে রশিটিকে মজবুত করে ধরে রেখে একজন মোজাহিদকে এ নির্দেশ দিলেন যে, রশি বেয়ে নীচে গিয়ে পাতিলার মধ্যে তুমি বসে কুপের ভিতরকার অবস্থা সম্পর্কে তদারকি করে আস।

অতঃপর মোজাহিদ কুপের মধ্যে নামতেই কুপের ভিতর থেকে গলা টিপে ধরার আওয়াজ শুনতে পেয়ে ভীত-স্বন্ত্রস্ত হয়ে উপরের দিকে চলে আসলেন। উপরে এসে কুপের মুখে দন্ডায়মান মোজাহিদদের জিজ্ঞেস করলেন, কুপের ভিতর থেকে গলা চেপে ধরা কোনো ব্যক্তির করুন স্বর কি আপনার শুনতে পেয়েছেন? সবাই বললেন হ্যাঁ। অতঃপর মোহাহিদ লোকটি বললেন, আপনারা আপন স্থানে দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি আবারো কুপের ভিতরে গিয়ে দেখে আসি। এ কথা বলে তিনি যখন আবার কুপের মধ্যে অবতরণ করলেন। এবং আবারো তিনি পূর্বের ন্যায় এ করুণ কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন একটি লোক কিছু কাঠের উপর বসে আছে আর তার নিচে রয়েছে পানি। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি মানুষ না জ্বীন? সে বলল আমি মানুষ। এবার মোজাহিদ ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে কিভাবে আসলে? সে বলল আমি এন্তাকিয়া শহরের লোক, আমি ঋণগ্রস্ত ছিলাম। মৃত্যূর পর ঋণের কারণে আমাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে। আমার পরিবার-পরিজন সকলেই এন্তাকিয়া শহরেই আছেন। তারা আমাকে ভুলে গিয়েছে। তারা আমার ঋণগুলো পরিশোধ করছে না। তারপর মোজাহিদ লোকটি অতি তাড়াতাড়ি কুপ থেকে বের হয়ে সাথীদেরকে বললেন, এক জিহাদের পর আরেক জিহাদ করতে হচ্ছে। যার ইচ্ছা বাড়ী চলে যেতে পারেন। এ কথা বলে মোজাহিদ বেচারা কয়েকজন সাথী নিয়ে সোজা এন্তাকিয়া চলে গেলেন। যথাস্থানে গিয়ে মৃত ব্যক্তির পরিবারদের খোঁজ করতে লাগলেন। ঘটনাচক্রে যার নিকট ঠিকানা জানতে চাইলেন সে ব্যক্তিই ছিল মৃত ব্যক্তির আওলাদ।

লোকটি বলল, ঘটনাটি সত্য। কারণ মৃত ব্যক্তিই আমার বাবা । আমরা একটি জমি বিক্রি করেছি। আপনি আমার সঙ্গে চলুন। আমরা আমাদের বাবার ঋণ পরিশোধ করে দিচ্ছি। এ কথা বলে তারা মোজাহিদ ব্যক্তিকে সাথে করে নিয়ে তাদের বাবার ঋণ পরিশোধ করে দিল। মোজাহিদ ব্যক্তি বলেন, এরপর আমরা এন্তাকিয়া ছেড়ে সোজা ঐ কুপের নিকট ফিরে এলাম। আমরা মনে করেছিলাম যে, কুপের ভিতরে ঐ লোকটিকে পাবো। কিন্তু সেখানে কোন কুপের নাম-নিশানাও নেই। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেল। তাই আমরা সেখানেই রাত্রি যাপন করলাম। রাতে স্বপ্নে দেখি যে, সেই লোকটি আমাদেরকে বলতেছে আল্লাহ তা’য়ালা আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদিন দান করুন। আপনারা যখন আমার ঋণ আদায় করে দিলেন তখন পরম করুণাময়, মহান দয়ালু আল্লাপাক আমাকে সেখান থেকে জান্নাতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!

ঋণ আদায়ের জন্য কিছু আমল

১. ঋণ পরিশোধের জন্য আমল

اللٰهمَ اكفنی بحلالك عن حرامك واغننی بفضلك عمن سواك٠  

উচ্চারণ- আল্লাহুম্মাক ফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়াগনিনি বি ফাদ্বলিকা আ‘ম মান ছিওয়াক।

নিম্নলিখিত দোয়া রাসূল (সাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) কে বলেছেন। আয়েশা (রাঃ) হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ) হতে বর্ণনা করেছেন। যদি কোনো ব্যক্তি পাহাড় সমান স্বর্ণ ঋণ করে থাকেন এবং এই দোয়া পড়েন তবে ঋণ আদায় হয়ে যাবে। আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ) বলেন, কিছুদিন এই দোয়া পাঠ করার ফলে আমার বহু ঋণ ছিল তা পরিশোধ হয়ে যায়। দোয়াটি হলো-

اللٰهم فارج الهم كاشف الغم مجيب دعوة المضطرين رحمٰن الدنيا والاخرة   ورحيمهما انت ترحمنی برحمة تغنينی بها عن رحمة من سواك٠

উচ্চারণ- আল্লাহুম্মা ফারিজাল হাম্মি কাশিফাল গাম্মি দা‘ওয়াতিল মুদ্বত্বাররিনা রাহমানাদ দুনয়া ওয়াল আখিরাতি ওয়া রাহিমাহুমা আনতা তারহামনি বিরাহমতি তুগনিনি বিহা আর রাহমাতি মিন ছিওয়াক।

(আনওয়ারুছ ছালিকিন)

২. কর্জ হতে পরিত্রাণ

ভোরে ৭ বার ও সন্ধায় ৭ বার করে নিচের আয়াত পাঠ করলে খোদা তায়ালা কর্জ হতে পরিত্রাণ দিয়ে থাকেন।

قل اللٰهم ملك الملك تؤتى الملك من تشاء وتنزع الملك ممن تشاء٠ وتعز من  تشاء وتذل من تشاء بيدك الخير٠ انك علی كل شئٍ قدير٠

উচ্চারণ- কুলিল্লাহুম্মা মালিকাল মুলকি তুতিল মুলকা মান তাশাউ ওয়া তানজিয়ুল মুলকা মিমমান তাশা, ওয়াতু ইযজু মান তাশাউ ওয়াতুজিললু মান তাশাউ বিয়াদিকাল খাইরু ইন্নাকা আ‘লা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদির।

(সূরা আলে ইমরানঃ আয়াত-২৬,২৭) (আমালে কোরআনী)

৩. কর্জ আদায়ের জন্য বিশেষ দোয়া

হযরত আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রঃ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, কর্জ আদায়ের জন্য কোন কার্যকরী আমল আছে কি? উত্তরে তিনি বলেন, করজ আদায়ের জন্য যে দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকরী ও মশহুর তাহলো-

اللٰهم انی اعوذبك من الهم والحزن واعوذبك من العجز والكسل واعوذبك من الجبن والبخل واعوذبك من غلبت الدين وقهر الرجال٠ اللٰهمَ اكفنی بحلالك عن حرامك واغننی بفضلك عمن سواك٠  

উচ্চারণ- আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হুজনি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল আযজি ওয়াল কাছলি, ওয়া আউজুবিকা যুবনি ওয়াল বুখলি, ওয়া আউজুবিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া ক্বাহরি রিজাল। আল্লাহুম্মাক ফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা ওয়া আগনিনি বিফাদ্বলিকা আ‘ম মান ছিওয়াক। (কামালিয়াতে আজিজি)

৪. ঋণ পরিশোধের জন্য নামাজ

জুমআর দিন সূর্য কিছু উপরে উঠলে এক সালামে ৪ রাকাত চাস্তের নামাজ আদায় করবেন। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতেহার পর আয়াতুল কুরসী, সূরা কাফিরূন, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক, সূরা নাছ ১০ বার করে পাঠ করবেন। এভাবে নামাজ শেষ করার পর আস্তাগফিরুল্লাহ ৭০ বার ও কালিমা তামজীদ ৭০ বার পাঠ করে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। ইনশাআল্লাহ ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

(২য় পর্ব সমাপ্ত)

(৩য় পর্ব পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন)

যোগাযোগ

০১৭১৬-৩৮৬৯৫৮

Email: nazruld@yahoo.com

What do you think?

0 points
Upvote Downvote

Comments

Leave a Reply

Loading…

0

Comments

0 comments

আমালিয়াত ১ম খন্ড, চতুর্থ অধ্যায় (১ম পর্ব)

প্রথম অধ্যায়, ১ম পর্ব