সাহাবী জুলাইবিবের (রা) জীবনী মো’মিনদের হৃদয়কে ব্যথিত করবে

সাহাবী জুলাইবিবের (রা) জীবনী

সাহাবী জুলাইবিবের (রা) জীবনী সম্পর্কে মুসলিমদের অনেকেই হয়তো জানেন না। তিনি ছিলেন রাসূল (সা) এর কাছে অতি প্রিয় একজন সাহাবী। আজ আমরা সাহাবী জুলাইবিবের (রা) জীবনী নিয়ে সংক্ষিত আলোচনা করব।

সাহাবী জুলাইবিবের (রা) জীবনী

জুলাইবিব (রা) নামে রাসূল (সাঃ) এর  এক সাহাবী ছিলেন। জুলাইবিব আসলে কোনো নাম নয়। আরবিতে এই শব্দের অর্থ ‘ক্ষুদ্র পূর্ণতাপ্রাপ্ত’। এই নাম দিয়ে মূলত জুলাইবিবের বামনতাকে বোঝানো হতো, কেননা তিনি ছিলেন উচ্চতায় অনেক ছোট। এছাড়া তাকে অনেকে ‘দামিম’ বলেও ডাকত, যার অর্থ কুশ্রী, বিকৃত অথবা দেখতে বিরক্তিকর। এমনকি তিনি যে সমাজে বাস করতেন, সেখানে তার বংশ পরিচয় কেউ জানত না। কেউ তার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না। তিনি এতটাই অবহেলিত ছিলেন সমাজে। তিনি যে কোন গোত্রের ছিলেন, তাও সবার অজানা ছিল। তৎকালীন সমাজে এটা ছিল এক চরম অসম্মানের বিষয়। তিনি কোনো বিপদে কারও সাহায্য পাওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারতেন না, কেননা সেই সমাজে কাউকে গুরুত্ব দেওয়া হতো তার বংশ পরিচয়ের ভিত্তিতে। মহানবী (সা.) এর নবুয়্যতের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন একজন আনসার, যার একমাত্র পরিচয় ছিল তিনি একজন আরব। খুব সম্ভবত তিনি ছিলেন মদিনা সীমান্ত এলাকার কোনো ক্ষুদ্র গোত্রের সদস্য, যিনি কিনা আনসারদের শহরে স্থানান্তরিত হয়েছেন, অথবা তিনি আনসারদেরই একজন। সেই সমাজে অনেকেই তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করত, এমনকি আসলাম গোত্রের আবু বারযাহ নামে এক ব্যক্তি তার বাড়িতে জুলাইবিবের প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিলেন। কোনো মেয়ে জুলাইবিবকে বিয়ে করার কথা চিন্তাও করত না। সেই সমাজের মানুষের কাছে তিনি সামান্য সাহায্য, সহানুভূতিও পেতেন না। কিন্তু মহানবী (সা.) এর দৃষ্টিতে জুলাইবিবের অবস্থান ছিল অনেক ওপরে। তিনি তার এই অনুগত সাহাবীর প্রয়োজন, আবেগ, ভাললাগা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। তাই একদিন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন- জুলাইবিব! কেমন আছো? জুলাইবিব বললেন- জান্নাতেও কি আমার জন্য একটি হুরাইনের ব্যবস্থা থাকবে না ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাসূল (সাঃ) তার মনের অবস্থা বুঝতেন এবং জুলাইবিবকে বললেন আমি তোমাকে বিয়ে দিতে চাই।
হযরত জুলাইবিব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো আমাকে বিয়ে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন, কিন্তু ঘটনাক্রমে অবস্থা যদি এই দাঁড়ায় যে, আমাকে কেউ পছন্দ করছে না! তখন? আল্লাহর নিকট মোটেই তুমি অপছন্দনীয় নও। বললেন নবীজি (সাঃ)। এরপর থেকেই নবীজি (সাঃ) হযরত জুলাইবিব (রাঃ) এর বিয়ের পাত্রী খুঁজছিলেন।

অনলাইনে একদম ফ্রিতে ইনকাম করার পদ্ধতি শিখতে চাইলে ভিজিট করুন

একদিন তাঁর খেদমতে উপস্থিত হয়ে এক আনসারী সাহাবী তাঁর এক বিধবা মেয়ের বিবাহের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আবদার পেশ করলেন। তখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন- তোমার মেয়েকে আমার কাছে বিবাহ দিয়ে দাও।
একথা শুনে আনসারী সাহাবী বেশ খুশি হলেন। বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন, আমি নিজের জন্য বলছি না।
সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, তবে কার জন্যে হে আল্লাহর রাসূল!
-জুলাইবিবের জন্য। -জুলাইবিব? হে আল্লাহর রাসূল! তাহলে আমি মেয়ের মায়ের সাথে একটু পরামর্শ করে আসি। নবীজি (সাঃ) বললেন, ঠিক আছে। পরামর্শ করে এসো। আনসারী সাহাবী বাড়ী গেলেন। স্ত্রীকে বললেন, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তোমার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। স্ত্রী বললেন, উত্তম প্রস্তাব। এ প্রস্তাবে আমাদের সাড়া দেওয়া উচিত। -কিন্তু তিনি নিজের জন্য এ প্রস্তাব দেননি।
-তবে কার জন্যে? -জুলাইবিবের জন্য! -না এ হয় না। আমরা জুলাইবিবের কাছে মেয়ে বিয়ে দেব না। এমন কতজনকেই তো আমরা ‘না’ বলে দিয়েছি।
আনসারী সাহাবী স্ত্রীর অমতে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, একদিকে নবীজি (সাঃ)-এর প্রস্তাব, অন্যদিকে স্ত্রীর অমত ও মেয়ের ভবিষ্যৎ- এমতাবস্থায় কী করব আমি!
চিন্তিত অবস্থায় সেই আনসার সাহাবী তার স্ত্রীর অমতের কথা রাসূলকে (সা) জানাতে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন, কিন্তু তার মেয়ে যিনি কিনা আড়াল থেকে সব শুনছিলেন, এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কে আপনাদের আমাকে বিয়ে দিতে বলেছেন?” উত্তরে মা বললেন, রাসূল (সা) তাকে জুলাইবিবের সাথে বিয়ে দিতে প্রস্তাব করেছেন। যখন মেয়েটি শুনলেন যে প্রস্তাবটি রাসূল (সা) এর কাছ থেকে এসেছে এবং তার মা সেটা প্রত্যাখ্যান করছেন, তিনি অবিচল হয়ে বললেন, “মা! আপনি কি জানেন না একজন মুমিনের পক্ষে উচিত নয় যে যখন আল্লাহ ও তার রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তখন সে ব্যাপারে তাদের কোনো মতামত থাকে? আপনারা কি আল্লাহর রাসূল (সা) এর অনুরোধ অমান্য করছেন? কত উন্নত জুলাইবিবের মর্যাদা যে, আল্লাহর রাসূল নিজেই তাঁর পক্ষ থেকে আপনাদের মেয়ের ব্যাপারে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। আপনাদের কি এই কথা জানা নেই যে, ফেরেশতারা রাসূলের আশেকের পায়ের ধূলাকেও ঈর্ষা করে? আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে নিয়ে যাও, তিনি নিশ্চয়ই আমার জন্য ধ্বংস ডেকে আনবেন না”। তিনি আরও বললেন, “আমি খুবই খুশি মনে নিজেকে নিবেদন করব তাতে, যাতে আল্লাহর রাসূল (সা) আমার জন্য ভালো মনে করেন”। আল্লাহর রাসূল (সা) বিয়ের ব্যাপারে মেয়েটির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে শুনলেন এবং

হযরত জুলাইবিব (রা)-এর সাথে ঐ মেয়ের বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। তারপর নবদম্পতির জন্য এই দোয়া করলেন-
হে আল্লাহ! তুমি ওদের জীবনে কল্যাণের ধারা বইয়ে দাও। ওদের জীবনকে কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন তুমি করো না। বলা হয়ে থাকে, তখন আনসারদের স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর (ওই মেয়ে) চেয়ে বেশি উপযুক্ত স্ত্রী আর কেউ ছিল না। বিয়ের পর জুলাইবিবের শাহাদাতের আগ পর্যন্ত তাঁরা এক সাথেই ছিলেন। একদিন এক অভিযানে যাওয়ার ডাক এলো।  প্রস্তুতিকালে জুলাইবিবের শ্বশুর তাঁকে বললেনঃ “শোনো জুলাইবিব। এটাতো কোনো আবশ্যিক জেহাদ নয়। এটা কেবলই একটা অভিযান। তুমি এই অভিযানে না গেলেই পারো” জুলাইবিব নিজের সুখময় জীবনের কথা না ভেবেই দ্বিধাহীন চিত্তে শ্বশুরমশাইকে জবাব দিলেনঃ “আব্বাজান! একি আশ্চর্যের কথা বললেন আপনি! এই অভিযানটি যুদ্ধে রূপ নেয়। যুদ্ধ শেষে খোঁজাখুঁজি করে অনেক সাহাবীকেই পাওয়া গেল না। এক পর্যায়ে নবীজি (সা) বললেন, আমি যে জুলাইবিবকে দেখছি না!
এবার সাহাবায়ে কেরাম হযরত জুলাইবিবের খোঁজে বের হলেন। কিন্তু গোটা যুদ্ধক্ষেত্র তন্নতন্ন করে খুঁজে কোথাও তাঁকে পেলেন না। অবশেষে আরো খোঁজাখুঁজির পর তাঁকে পাওয়া গেল নিকটবর্তী অন্য একটি স্থানে- শহীদ অবস্থায় পাশে পড়ে আছে সাতজন কাফেরের কর্তিত লাশ। রাসূল (সা) কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন এবং তিনবার বললেন জুলাইবিব আমার জন্য এবং আমি জুলাইবিবের জন্য, ওয়াল্লাহি কী সৌভাগ্য জুলাইবিবের।
কিছুক্ষণ পর রাসূল (সাঃ) হাসলেন এবং সাহাবিরা কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি দেখছি আল্লাহ জান্নাতে জুলাইবিবকে একটি ঘর দিলেন এবং সেখানে একজন হুরাইন তার সামনে হাটাহাটি করছে, আল্লাহু আকবর।
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, আনসার সাহাবীদের মধ্যে জুলাইবিবের স্ত্রীর চেয়ে অধিক দানশীলা মহিলা আর কেউ ছিলেন না।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে সাহাবীদের মর্যাদা সম্পর্কে জানতে ভিজিট করুন

What do you think?

0 points
Upvote Downvote

Comments

Leave a Reply

Loading…

0

Comments

0 comments

সিলেট৭৮৬ ডটকমে সবাইকে স্বাগতম

সিলেট৭৮৬ ডট কম এর পক্ষ থেকে ভিজিটরদের সবাইকে স্বাগতম

খতমে খাজেগানের ফজিলত ও বিশেষ উপকারিতা

খতমে খাজেগানের ফজিলত ও বিশেষ উপকারিতা