দ্বিতীয় অধ্যায়, ১ম পর্ব

লেখক: হযরত মাওলানা ক্বারী মো: নজরুল ইসলাম সাহেব, ভাদেশ্বরী। (এমএম, এমএ)

আমালিয়াত ১ম খন্ড, দ্বিতীয় অধ্যায়, ১ম পর্ব

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সময়ের স্বল্পতাহেতু সকল আয়াত বা বাক্যের হরকত দেয়া সম্ভব হয়নি।

ইনশাহ আল্লাহ ধীরে ধীরে প্রতিটি আয়াত বা বাক্যের হরকত সংযোজন করা হবে তথা যের, যবর, পেশ সংযোজন করা হবে। তাই আপডেট পেতে সাথে থাকুন।

প্রথম পর্ব শুরু

প্রদত্ত আমলসমূহ কবুল হওয়ার জন্য কতিপয় শর্ত মেনে চলা অত্যন্ত প্রয়োজন-

১. শরীয়তের পূর্ণ অনুস্বরণ, হালাল খাদ্য গ্রহণ, সদা সত্য কথা বলা। 

২. অতি দ্রুত আমলের ফল পেতে চাইলে: ১ নং শর্ত, কামিল/আমিল উস্তাদের অনুমতি, আমলের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস, রোজা রাখা, নির্জনতা অবলম্বন করা, সর্বদা অযুর সাথে থাকা, তরকে হায়ওয়ানাত (জালালী ও জামালী), অসৎ সঙ্গ পরিত্যাগ, অহেতুক কথা বলা বর্জন, যে আমল শুরু করবেন তা গোপন রাখা ও ফল দেখতে না পেলে দৈর্য্য না হারানো এবং ১ চিল্লায় ফল না পেলে ৩ চিল্লা করবেন এতে অবশ্যই ফল পাবেন।

হাজত পূরণের জন্য আমলসমূহ 

১. মকছুদ হাসিলের জন্য খাজা খিযির (আঃ) এর নামাজ

ইমাম শাফেয়ী (র) তাঁর নিজ হস্তে লিখিত “বিয়ায” নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই হাজতের নামাজ আদায় করলে ১ হাজার মকছুদ পূর্ণ হয়ে থাকে। হাকিম আবুল কাসেম বর্ণনা করেছেন যে, এই আমল খাজা খিযির (আঃ) কোনো এক আবেদ ব্যক্তিকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমি এই নামাজের নিয়ম জানার জন্য ঐ আবেদের নিকট লোক পাঠালাম এবং তিনি আমাকে উক্ত নামাজের নিয়ম শিক্ষা দেন। আমি এই নামাজ যথা নিয়মে আদায় করে আল্লাহপাকের দরবারে ইলম ও হিকমতের জন্য দোয়া করি। এই নামাজের ওছিলায় আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে ইলম ও হিকমত দান করেন। এমনকি এই নামাজ আদায়ের ফলে আমার ১ হাজার মকছুদ পুরা হয়েছে।

নামাজের নিয়ম

২ রাকাত নফল নামাজ এভাবে পড়বেন যে, প্রথম রাকাতে সূরা ফাতেহার পর ১০ বার সূরা কাফিরুন, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহার পর ১১ বার সূরা ইখলাছ পড়বেন এবং নামাজ শেষ করে সালাম ফিরানোর পর একটি সিজদা করবেন। সিজদার মধ্যে দুরূদ শরীফ ১০ বার

سبحان اللٰه و الحمد للٰه ولا اله الا اللٰه واللٰه اكبر ولا حول ولا قوة الا بالله العلي العظيم٠

 উচ্চারণ: সোবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়ালহু আকবার, ওয়ালা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহিল আ‘লীয়িল আ‘জিম। ১০ বার এবং

ربنا اٰتنا في الدنيا حسنة وفي الاخرة حسنة وقنا عذاب النار٠

 উচ্চারণ: রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনয়া হাছানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাছানাতাও ওয়াক্বিনা আ‘জাবান নার। ১০ বার পড়বেন। এবং সিজদারত অবস্থায় আপনার মকছুদের কথা কায়মনে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাবেন। (আমালে কোরআনী)

২. সূরা ইয়াসিনসূরা মূলক তিলাওয়াতের মাধ্যমে মকছুদ হাসিল

সূরা ইয়াসিনে মোট চারবার الرحمٰن ও তিনবার اللٰه শব্দ উল্লেখিত হয়েছে। অনুরূপ মূলক সূরায়ও মোট চারবার الرحمٰن ও তিনবার اللٰه শব্দ আছে। হাজত পূরণের নিয়ত করে সূরা ইয়াছিন এভাবে তিলাওয়াত করবেন যে, الرحمٰن শব্দ উচ্চারণ করার সময় ডান হাতের কনিষ্ট অঙ্গুলি বন্ধ করবেন এবং اللٰه শব্দ উচ্চারণের সময় বাম হাতের কনিষ্ট অঙ্গুলি বন্ধ করবেন। এভাবে সমস্ত ইয়াসিন সূরা তিলাওয়াত করা শেষ করলে ডান হাতের চারটি আঙ্গুল ও বাম হাতের তিনটি আঙ্গুল বন্ধ হবে। তারপর মূলক সূরা এভাবে তিলাওয়াত করবেন যে, যখন الرحمٰن শব্দ উচ্চারণ করবেন তখন ডান হাতের কনিষ্ট অঙ্গুলি খুলবেন এবং اللٰه শব্দ উচ্চারণের সময় বাম হাতের কনিষ্ট অঙ্গলি খুলবেন। এভাবে সমস্ত বন্ধ আঙ্গুল খুলে যাবার পর সম্পূর্ণ সূরা তিলাওয়াত করা শেষ করবেন। এবং আল্লাহর কাছে আপনার মকছুদের জন্য প্রার্থনা করলে দোয়া কবুল হয়। (আমালে কোরআনী)

৩. ইয়া লাতিফু ইসিম মোবারকের মাধ্যমে মকছুদ হাসিল

আল্লাহপাকের রয়েছে ৯৯টি গুণবাচক নাম । তন্মধ্যে ৪৫টি ইসিম আছে যাদেরকে বলা হয় “আছমায়ে রহমত”। এগুলোকে আছমায়ে জামালীও বলা হয়। এই আছমায়ে রহমত এর মধ্যে ৭টি নাম উচ্চ মর্যাদা ও রিজিক বৃদ্ধির জন্য প্রসিদ্ধ। যার মধ্যে يا لطيف ইসিমটি মনের জায়েজ মকছুদ পূরণের জন্য অতিব গুরুত্বপূর্ণ। লাতিফ শব্দে-

ل ط  ى  ف এই যে ৪টি হরফ আছে, তাদেরকে আবজাদে ক্বামারী দ্বারা হিসেব করলে এদের সংখ্যা হয় ১২৯। যদি কোনো ব্যক্তি জায়েজ উদ্দেশ্য হাসিলের ইরাদা করে يا لطيف  ইসিমটি ১২৯১২৯=১৬৬৪১ বার একই বৈঠকে কম-বেশি না করে পড়ে শেষ করেন তাহলে আল্লাহ তাঁর মনোবাঞ্চনা পুর্ণ করেন। এই ইসিমটির খতম পড়ার নিয়ম হলো প্রতি ১২৯ বার পাঠ করে ৩ বার নিচের আয়াতটি তিলাওয়াত করবেন।

لاتدركه الابصار وهو يدرك الابصار وهو اللطيف الخبير٠

(সূরা আনআমঃ আয়াত-১০৩)

এভাবে ১২৯ তাছবীহ পড়বেন। তাহলে ১৬৬৪১ বার হবে। খতম শুরু করার আগে ও পরে ৩ বার করে দুরূদ শরীফ পড়বেন।

ইমাম দামিরী (রঃ) বলেন, আমার শায়েখ (রঃ) আমাকে বলেছেন যে, প্রয়োজন পূরণ, খয়ের-বরকতের উদ্দেশ্যে, চিন্তা-ভাবনা দূর করার উদ্দেশ্যে এই আমল অতিব ফলপ্রসূ।

কোনো কোনো কিতাবে উল্লেখ আছে যে, প্রতিদিন ১৯০০ বার করে ১৯ দিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে হবে। পড়ার আগে ও পরে দুরূদে ইব্রাহিম ৩ বার পাঠ করতে হবে। তাহলে উক্ত আয়াতের জাকাত আদায় হয়ে যাবে। যাকাত আদায়ের পর সামান্য শিরনী বিতরণ করবেন। (মশহুর)

 ৪. বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আমল

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে রেওয়ায়েত যে, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার রোজা রাখবেন এবং জুম্মার দিন গোসল করে মসজিদে যাবেন এবং যাবার সময় পথে সাধ্যমত কিছু সদকা করবেন। তারপর নামাজ শেষ করে নিচের দোয়া পড়বেন। দোয়াটি হলোঃ

اللٰهم انی اسئلك باسمك الرحمٰن الرحيم اللٰه لااله الاهوالحى  القيوم لاتئخذه سنة ولانوم له  ما فی السموات ومافی الارض من ذالذی يشفع عنده الا باذنه يعلم ما بين ايديهم وما خلفهم الذي عنت له الوجوه وخشعت له الاصوات ووجلت القلوب من خشيته اسئلك ان نصلى على سيدنا محمد وعلٰى اٰله واصحابه وان تقضى حاجتى٠ 

 উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আছআলুকা বি-ইসমিকার রাহমানুর রাহিম। আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লাহু আল হাইয়ুল ক্বাইয়ুমু লা তা‘খুজুহু ছিনাতুও ওয়ালা নাওম। লাহু মাফিছ ছামাওয়াতি ওয়ামাফিল আরদ্ব, মানজাল লাজি ইশফায়ু ই‘নদাহু ইল্লা বি-ইজনিহ। ইয়ায়‘লামুমা বাইনা আইদিহিম ওয়ালা খালফাহুম, আল্লাজি আ‘নাতা লাহুল ওজুহু ওয়া খাশায়াত লাহু আসওয়াতি ওয়া ওজিলাতিল কুলুবু মিন খাশয়াতিহি আছআলুকা আন নুসাল্লি ওয়া তুছাল্লিমা আ‘লা ছায়্যিদিনা মুহাম্মদিও ওয়া আ‘লা আলিহি ওয়া আসহাবিহি ওয়া আন তাক্বদী হাজাতি।

এখানে ‘হাজাতি’ এর স্থলে নিজের হাজতের কথা বলবেন। তাহলে অচিরেই আপনার উদ্দেশ্য সফল হবে।

এই আমল সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বলেন- এই দোয়া জাহিল ও জালিম লোকদের শিখাবেন না। তাহলে একজন আরেকজনের উপর বদদোয়া করতে পারে আর এটা কবুল হয়ে যাবে। ফলে তারা  উভয়ই ধ্বংশ হয়ে যাবে। (মুজর্রবাতে দেরভি)

 ৫. যে কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের আমল

হযরত মাওলানা জনাব কামরুল হুদা খান ছিদ্দিকী ছাহেব তাঁর একটি বিখ্যাত কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত আব্দুল কাদীর জিলানী (র) বলেছেন- যে ব্যক্তি ঈশার নামাজের পর একাধারে ১০ বার করে ১০ দিন নিচের দোয়াটি পড়িবে, আল্লাহ তা’য়ালার হুকুমে নিশ্চয়ই তাঁর জায়েদ উদ্দেশ্য হাসিল হবে।

بسم الله الرحمن الرحيم٠  سبحان الله القادر القاهر القوى  الكافي يا حي يا قيوم لا حولا ولا قوﺓ الا بالله العلي العظيم٠

উচ্চারণ: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, সোবহানাল্লাহুল ক্বা-দিরি আল ক্বা-হিরুল ক্বাওয়ীয়ুল কাফি ইয়া হাইয়ু, ইয়া ক্বাইয়ুম। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়িল আজিম। 

৬. জায়েদ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পরীক্ষিত আমল 

যে কোনো প্রকার জায়েদ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নিচের দোয়াটি অতি ফলপ্রদ। আমলটি ১২ দিনের এবং আরবি মাসের শুরুর দিকে করবেন।

আমলের নিয়ম হলো গোসল করে পাক-পবিত্র বিছানায় বসে প্রতিদিন একই সময়ে ১২০০ বার নিচের দোয়াটি পাঠ করবেন। এভাবে ১২ দিন আমল করবেন। আমল করার আগে ও পরে ৩ বার করে দুরূদ শরীফ পড়বেন। আর আতর, গোলাপজল, আগরবাতি ব্যবহার কববেন এবং লোবান জ্বালিয়ে ধুনী দিবেন। দোয়াটি হলো-

يا بديع العجاﺌب بالخير يا بديع٠

৭. কঠিন সমস্যা সমাধানের আমল

যখন কোন সমস্যার সম্মুখীন হবেন তখন গোসল করে পবিত্র কাপড় পরিধান করবেন এবং গায়ে সুগন্ধি লাগাবেন। অতঃপর জায়নামাজে বসে আয়াতুল কুরসী ৩ বার, আমানার রাসূলূ বিমা হতে সম্পূর্ণ আয়াত ৩ বার, সূরা কাফিরুন, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক, সূরা নাস ৩ বার করে পাঠ করে স্বীয় শরীরে ফুঁক দিবেন। তারপর সূরা ফাতেহা নিম্নোক্ত নিয়মে ৭ দিন তিলাওয়াত করবেন। রবিবারে পড়বেন ৫৮ বার-

بسم الله الرحمن الرحيمِ الحمد لله رب العالمين٠ 

 “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমিল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।”

সোমবারে পড়বেন -৬১৮ বার

“আর রাহমানির রাহিম।” 

মঙ্গলবার পড়বেন -২৪২ বার

“মালিকি ইয়াওমিদ্দিন।”

বুধবার পড়বেন -২৩৬ বার

“ইয়য়াকানায় বুদু ওয়া ইয়া ইয়য়াকানাছ তায়িন।” বৃহস্পতিবার পড়বেন -৩৬০ বার

“ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম।

শুক্রবার পড়বেন -১৩০৪ বার

“গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দোয়াল্লিন, আমীন।” উক্ত আমলে ৭দিনের মধ্যেই মনের বাসনা পূর্ণ হবে।

রাসূলুলল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি নিদ্রায় যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক, ও সূরা নাস পাঠ করে, আল্লাহ পাক তাঁর হিফাজতের জন্য ২ জন ফেরেস্তা নিযুক্ত করেন। ঐ রাতে যদি এই ব্যক্তি মারা যায় তাহলে আল্লাহ তা’য়ালা ঐ ব্যক্তির সকল পাপ ক্ষমা করে দেন। 

৮. আশা-আকাংখা পূরণ হওয়ার আমল

হযরত মাওলানা জনাব কামরুল হুদা খান ছিদ্দিকী ছাহেব তাঁর একটি বিখ্যাত কিতাবে অতিব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, নিজের মকছুদ পূরণের জন্য পাক-পবিত্র হয়ে নির্জন হুজরায় বসে একাগ্রচিত্তে قادير يا ইসিমটি প্রথম দিন ১ হাজার বার, দ্বিতীয় দিন ২ হাজার বার, তৃতীয় দিন ৩ হাজার বার, এভাবে প্রতিদিন ১ হাজার করে বর্দ্ধিত করে ১২ দিন পর্যন্ত আমল করবেন। আমল শুরু করার আগে ও পরে বিসমিল্লাহসহ ১১ বার করে দুরূদ শরীফ পাঠ করবেন আমল শেষে ২ রাকাত নফল নামাজ পড়ে নবী করীম (সাঃ) এর নামে দোয়া বখশীশ করবেন। এছাড়া আমলের সময় আতর, গোলাপজল, কস্তরী ইত্যাদি ব্যবহার করবেন। ইনশাহ আল্লাহ উদ্দেশ্য হাসিল হবে। প্রথম ১২ দিনে আমলের কোন ফল না পেলে মাঝখানে ২ দিন বিরতি দিয়ে পুনরায় ১২ দিন আমল করবেন। এই চিল্লায় অবশ্যই ফল পাইবেন। আমলটি পরীক্ষিত। (নাফিউল খালায়েক)

(দ্বিতীয় অধ্যায়, ১ম পর্ব সমাপ্ত)

(দ্বিতীয় অধ্যায়, ২য় পর্ব পড়তে চাইলে ক্লিক করুন)

যোগাযোগ

০১৭১৬-৩৮৬৯৫৮

Email: nazruld@yahoo.com

What do you think?

0 points
Upvote Downvote

Comments

Leave a Reply

Loading…

0

Comments

0 comments

প্রথম অধ্যায়, ৩য় পর্ব

দ্বিতীয় অধ্যায়, ২য় পর্ব