শবে বরাতের ফজিলত : শবে বরাত বা ليلة النصف من شعبان (লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান) শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে বলা হয়। ফারসি ভাষায় ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নাজাত। তাই এর অর্থ মুক্তির রাত বা লাইলাতুল বারাআত। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাজিল করেন, গুনাহ মাফ করেন এবং অসংখ্যকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। এটি রমজানের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত, যেখানে ইবাদতের মাধ্যমে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা যায়।
শবে বরাতের ফজিলত কুরআনের আলোকে
কুরআনে সরাসরি শবে বরাতের নাম উল্লেখ নেই। তবে সূরা আদ-দুখানে বরকতময় রাতের উল্লেখ আছে, যা কিছু তাফসিরে এর সাথে যুক্ত করা হয়:
حم وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ (সূরা আদ-দুখান: ১-৪)
অর্থ: হা-মীম। সুস্পষ্ট কিতাবের কসম। নিশ্চয়ই আমি তা অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এতে প্রত্যেকটি হিকমতপূর্ণ বিষয় ফয়সালা করা হয়।
অধিকাংশ মুফাসসির (যেমন ইবনে কাসির) এটিকে শবে কদর বলে মনে করেন। তবে কিছু তাফসিরে (যেমন মাআরিফুল কুরআন) এটিকে শবে বরাতের সাথেও যুক্ত করা হয়েছে, কারণ এ রাতে ভাগ্যের ফয়সালা ও রহমতের বিষয় উল্লেখ আছে। এটি সরাসরি প্রমাণ নয়, বরং ইঙ্গিত।
শবে বরাতের ফজিলত হাদিসের আলোকে
হাদিসে এ রাতের ফজিলত স্পষ্টভাবে বর্ণিত। বিভিন্ন সাহাবী থেকে একাধিক রিওয়ায়াত এসেছে, যা একে অপরকে শক্তিশালী করে। শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানীসহ অনেক মুহাদ্দিস এগুলোকে সহিহ বলেছেন।
১. হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত: يَطَّلِعُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِلَى خَلْقِهِ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ (সহিহ: সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহাহ ১১৪৪; ইবনে হিব্বান ৫৬৬৫; মুসনাদ আহমাদ)
অর্থ: আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্য রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।
এ হাদিস একাধিক সাহাবী (আবু হুরায়রা, আয়েশা, আবু বকর প্রমুখ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যা পরস্পরকে শক্তিশালী করে।
২. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে: إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِعِبَادِهِ أَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ بَنِي كَلْبٍ (তিরমিযী ৭৩৯; ইবনে মাজাহ; আলবানী কর্তৃক সহিহ)
অর্থ: আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্য রাতে নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন এবং বনী কালব গোত্রের ছাগলের পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন।
শবে ক্বদরের ফজিলত ও আমল জানতে ভিজিট করুন
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) এ রাতে দীর্ঘ সেজদায় থাকতেন, এত দীর্ঘ যে তিনি ভয় পেয়ে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল নাড়েন।
৩. অন্য রিওয়ায়াতে: রাসূল (সা.) বলেন, এ রাতে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন, ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করেন, কিন্তু বিদ্বেষ পোষণকারীদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।
এ রাতে ভাগ্য লিখনের হাদিসগুলো দুর্বল বা জাল বলে বিবেচিত। সহিহ হাদিস অনুসারে ফজিলত মাগফিরাত ও রহমতের।
শবে বরাতের আমল (সংক্ষিপ্ত ও সহিহ দিকনির্দেশনা অনুযায়ী)
শবে বরাত (শা‘বান মাসের ১৫তম রাত) উপলক্ষে যে আমলগুলো করা উত্তম—তা হবে ব্যক্তিগত, নীরব ও সুন্নাহসম্মত।
1️⃣ তওবা ও ইস্তিগফার
নিজের গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া—এটাই এই রাতের প্রধান আমল।
2️⃣ নফল নামাজ আদায়
তাহাজ্জুদ বা সাধারণ নফল নামাজ পড়া যায়। কোনো নির্দিষ্ট রাকাত বা বিশেষ নামাজ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।
3️⃣ কুরআন তিলাওয়াত
পরিমাণের চেয়ে মনোযোগ ও খুশু সহকারে তিলাওয়াত করা উত্তম।
4️⃣ দোয়া করা
নিজের জন্য, পরিবার, মৃত আত্মীয় ও সমগ্র উম্মাহর জন্য দোয়া করা। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া।
5️⃣ বিদ্বেষ ও হিংসা থেকে মুক্ত হওয়া
হাদিসে এসেছে—বিদ্বেষী ব্যক্তি এ রাতে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই অন্তর পরিষ্কার করা জরুরি।
6️⃣ পরদিন (১৫ শা‘বান) নফল রোজা
কিছু আলেমের মতে পরদিন নফল রোজা রাখা উত্তম; তবে একে ফরজ বা আবশ্যক মনে করা যাবে না।
7️⃣ বিদ‘আত ও অপচয় পরিহার
আতশবাজি, নির্দিষ্ট রাকাতের বিশেষ নামাজ, শোরগোল বা অইসলামিক আয়োজন থেকে বিরত থাকা জরুরি।
শবে বরাতে যারা ক্ষমা পাবে না—হাদিসের আলোকে (সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে):
হাদিসে এসেছে, শা‘বান মাসের ১৫তম রাতে আল্লাহ তাআলা অধিকাংশ বান্দাকে ক্ষমা করেন; তবে কিছু মানুষ এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে—
1️⃣ মুশরিক — যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে।
2️⃣ মুশাহিন (বিদ্বেষী/হিংসাপোষণকারী) — যার অন্তরে কারও প্রতি শত্রুতা ও ঘৃণা জমে আছে।
3️⃣ পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি — যারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কষ্ট দেয়।
4️⃣ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী — সিলাতুর রহম ভঙ্গকারী।
5️⃣ অহংকারী ও অত্যাচারী — যারা অন্যের হক নষ্ট করে।
6️⃣ অবৈধ কাজে লিপ্ত ব্যক্তি — যেমন ব্যভিচার, মদ্যপান ইত্যাদিতে অনুতাপহীন থাকা।
স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক বজায় রাখার সহজ কৌশল জানতে ভিজিট করুন

























































































